রবিবার ১৪ অগাস্ট ২০২২



ভারতে হিন্দু ফ্যাসিবাদী এন্টারপ্রাইজ


আলোকিত সময় :
23.06.2022

আলোকিত সময় ডেস্ক :

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত রাজ্যগুলোর সরকার কয়েক মাস ধরে মুসলিমদের বাড়ি, দোকান ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলছে। এ অন্যায় আচরণের শিকার মানুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ- এরা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেছে। ওই রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রী আবার বেশ গর্বের সঙ্গে তাঁদের এ বিক্ষোভ দমনের কৌশল নির্বাচনী সভাগুলোতে তুলে ধরছেন। আমার মনে হয়, এ ধ্বংসযজ্ঞ এমন এক সময়ের স্মারক যখন একটা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ও ভঙ্গুর গণতন্ত্র সবার চোখের সামনে নির্লজ্জভাবে একটা দুর্বৃত্ত ও হিন্দু ফ্যাসিবাদী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ তাতে সোৎসাহে সমর্থন দিচ্ছে। আমরা এখন হিন্দু সাধুবেশী গুন্ডাদের দ্বারা শাসিত হচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। এদের কাছে মুসলিমরা হলো এক নম্বর গণশত্রু।

এর আগে মুসলিমরা গণহত্যা, গণপিটুনিতে হত্যা, পরিকল্পিত খুন, হেফাজতে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভুয়া অভিযোগে জেলবাসের শিকার হয়েছে। বুলডোজার দিয়ে তাদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া ওই তালিকায় একটি নতুন সংযোজন। বিজেপি এটাকে একটা মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে দেখছে। গণমাধ্যমে ওই ঘটনাগুলো যেভাবে এসেছে তাতে মনে হচ্ছে, বুলডোজারকে সাধারণভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই; এতে একটা স্বর্গীয় ও প্রতিশোধমূলক শক্তি আরোপ করা হয়েছে। এর যে বিশাল ধাতব থাবা, যা দিয়ে ‘শত্রুকে বিনাশ’ করা হচ্ছে তাকে পুরাকথার অসুরবিনাশী দেবতার একটা যান্ত্রিক সংস্করণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এ বুলডোজার এখন প্রতিশোধপরায়ণ হিন্দু জাতির কাছে একটা কবচে পরিণত হয়েছে।
এমন অপকর্মের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে ভারত সরকারের লোকজন খুব জোর দিয়ে বলছেন, মুসলিমরা তাঁদের লক্ষ্যবস্তু নয়; তাঁরা শুধু অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ এটা এক ধরনের পৌর কর্তৃপক্ষের রুটিন দায়িত্ব পালনের মতো। তবে এসব যুক্তি বিশ্বাসের অযোগ্য বললেও কম বলা হয়। এটা হলো এক ধরনের তামাশা, যার লক্ষ্য ভীতি ছড়ানো। শুধু সরকার নয়; অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিকও জানে, দেশের প্রতিটি শহরের বেশিরভাগ স্থাপনা হয় বেআইনিভাবে অথবা আইনকে চতুরতার সঙ্গে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে। তা ছাড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নামে মুসলিমদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙা হচ্ছে সংশ্নিষ্ট মালিককে কোনো প্রকার নোটিশ দেওয়া ছাড়াই এবং কোনো প্রকার আপিল বা শুনানির সুযোগ না দিয়ে। অর্থাৎ বুলডোজারওয়ালারা এক ঢিলে অনেক পাখি মারতে পারছে।

বুলডোজার যুগ শুরুর আগে মুসলিমদের শাস্তি দেওয়া হতো নিজের মতো করে আইন হাতে তুলে নেওয়া জনতার দ্বারা; পুলিশ সেখানে হয় অংশগ্রহণকারী হতো, নয় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করত। তবে বুলডোজার অভিযানে শুধু পুলিশকেই কাজে লাগানো হচ্ছে না; সংশ্নিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। সেখানে এমনকি আদালতও থাকছেন ঘটনার সময় তাতে কোনো হস্তক্ষেপ না করে দর্শকের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে এবং মিডিয়া থাকছে দর্শনীয় অসুরবধের ঘটনাবলি আকর্ষণীয়ভাবে সরাসরি প্রচার করার জন্য। এর উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদের এই বার্তা দেওয়া- ‘তোমরা এখন একা; কেউ তোমাদের বাঁচাতে আসবে না; কোনো আদালত তোমাদের আবেদন শুনবে না। এ প্রাচীন গণতান্ত্রিক দেশে শাসন কাঠামোয় ভারসাম্য সৃষ্টির প্রয়োজনে যত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল সব এখন তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হবে।’

লক্ষণীয়, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যাঁরা অন্য ধর্মের, তাঁদের সম্পত্তি কিন্তু এ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ ১৬ জুনের একটা বিক্ষোভের কথা বলা যায়, যেখানে হাজার হাজার তরুণ বিজেপির নতুন সেনা নিয়োগ পলিসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে উত্তর ভারতে ব্যাপক সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তারা রেল ও অন্যান্য যানবাহন পুড়িয়ে দেয়; রাস্তা অবরোধ করে। এমনকি একটা শহরের বিজেপি অফিস পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়। ওই বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশ ছিল অমুসলিম। কাজেই তাদের ঘরবাড়ি ও পরিবারকে এ জন্য কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

২০১৪ ও ‘১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি এটা স্পষ্ট করেছে- সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জেতার জন্য তাদের ২০ কোটি মুসলিমের ভোটের দরকার নেই। এ কারণেই আমরা এখন এক ধরনের ভোটাধিকার হরণের অভিযান দেখতে পাচ্ছি। এর ফল হতে পারে ভয়াবহ। কারণ, একবার ভোটাধিকার হারানোর পর আপনার কোনো মূল্য থাকবে না; আপনি হয়ে যাবেন ভোঁতা এক ছুরির মতো। আপনাকে শুধু ব্যবহার নয়; অপব্যবহারও করা যাবে। বর্তমানে আমরা এ রকমই একটা পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। এমনকি বিজেপির উঁচু পর্যায়ের নেতারা মুসলিমদের পবিত্র বস্তুগুলোকে অবমাননা ও হেয় করার পরও দলটির মূল সমর্থক গোষ্ঠীর কাছ থেকে সামান্য অর্থপূর্ণ সমালোচনাও শোনা যায়নি; তাদের সমর্থন হারানো তো দূরের কথা।
মুসলিমরা এসব অবমাননার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে। এ বিক্ষোভের কারণ আমরা বুঝি। এ অবমাননার আগে তাদের অনেক সহিংসতা ও বর্বরতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ওইসব বিক্ষোভের সময়, যেমনটা এমন পরিস্থিতিতে বরাবর দেখা যায়, কিছু বিক্ষোভকারী ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছে; বিজেপি অবশ্য মহা আনন্দে এটা পাস করবে। কারণ তখন হিন্দু জাতীয়তাবাদবিরোধী যে কোনো সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে শাস্তি দেওয়া যাবে।

বর্তমানে ভারতে আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি, তাকে পোড়ামাটি নীতির রাজনৈতিক সংস্করণ বললে ভুল বলা হবে না। বহু বছরের চেষ্টায় যেসব প্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে উঠেছে, তার প্রতিটি এখন ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। আমরা এ অবস্থা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছি। এমন একটা নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠতে যাচ্ছে, যাদের মগজ ইতোমধ্যে ধোলাই হয়ে গেছে; দেশটির ইতিহাস বা জটিল সাংস্কৃতিক বুনন সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণা থাকবে না। শাসকরা তো আছেই; তাদের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে ৪০০ টিভি চ্যানেল, অসংখ্য ওয়েব পোর্টাল ও সংবাদপত্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তল্পিবাহক প্রচারমাধ্যম। এরা অহোরাত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে ধর্মান্ধতা ও ঘৃণা ছড়াচ্ছে, আর তাদের সঙ্গে আছে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের উভয় পাশে সক্রিয় ঘৃণা উগরে দেওয়া মানুষ।
এদিকে ডানপন্থি হিন্দু শিবিরে একটা নতুন আগ্রাসী শক্তির উত্থান ঘটেছে, যারা অত্যন্ত অস্থির; যাদের নিয়ন্ত্রণে মোদি সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ এরাই বিজেপির মূল সমর্থক গোষ্ঠী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এটা একটা নিয়মিত দৃশ্য হয়ে গেছে, যেখানে মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানোর প্রকাশ্য আহ্বান জানানো হয়। আমরা এমন একটা বিন্দুতে পৌঁছে গেছি যেখান থেকে ফেরা প্রায় অসম্ভব।

লেখক : অরুন্ধতী রায়

বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় লেখক, চিন্তাবিদ, অ্যাকটিভিস্ট।

আলজাজিরা ডটকম থেকে ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি