রবিবার ১৪ অগাস্ট ২০২২



পদ্মা সেতু, নিছক লোহালক্কড়ের স্থাপনা নয়


আলোকিত সময় :
04.07.2022

কাওসার চৌধুরী:

প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা

অতি বর্ষণে পাটুরিয়া ফেরিঘাট প্লাবিত; জলমগ্ন দৌলতদিয়া ঘাট। তীরে ভেড়ার কোনো জায়গা পাচ্ছে না ফেরি। শত শত যাত্রীবাহী গাড়ি আর পণ্যবাহী ট্রাক সারি বেঁধে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পাটুরিয়া ও দৌলতিয়া ঘাটে। নারী-শিশু আর বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে। অজস্র পচনশীল কাঁচামাল পদ্মার দু’পাড়ে পচে-গলে ধ্বংস হওয়ার উপক্রম। কয়েকশ কোটি টাকার পণ্য আর সম্পদ নদীর ঘাটেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের সংবাদ এখন থেকে আর খবরের কাগজে দেখা যাবে না। দেখা যাবে না টেলিভিশনের পর্দায়ও। কারণ একটাই- পদ্মা সেতু। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হয়ে যাওয়ার পর দুর্ভোগ আর সম্পদহানির এই ‘পুরোনো চিত্র’ দেখার অবসান হলো ধরে; নেওয়া যায়।

এখন সম্ভবত আর শুনতে হবে না- পদ্মায় ফেরি পারাপারে অসহনীয় জটের কারণে আটকে পড়া কোনো রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সেই প্রাণ দিতে হয়েছে। শুনতে হবে না পদ্মায় লঞ্চডুবিতে মৃত্যুর খবর। টিভি পর্দায় দেখতে হবে না পদ্মায় নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনের উদ্বিগ্ন মুখ। শুনতে হবে না পদ্মায় সন্তান হারানো মায়ের বুকফাটা কান্না। না; এসব আর শুনতে হবে না বলেই বিশ্বাস করছি। বাস্তবতাও তাই। পদ্মা সেতু তার দুর্গম যাত্রায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশের মানুষের সেবায় বুক পেতে আছে!

সেতু বিভাগ ঘোষণা করেছে, আগামী ২০২৩ সালের জুন মাসে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হবে। আশা করা যায়, পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হলে বরিশালে বসবাস করেই প্রতিদিন রাজধানী ঢাকা শহরে অফিস করার স্বপ্ন পূরণ হবে। মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর- এগুলো ঢাকার নিকটবর্তী জেলা। রেলপথ চালু হয়ে গেলে উল্লিখিত জেলাগুলোসহ যশোর, নড়াইল, মাগুরা, খুলনা থেকেও রাজধানীতে অফিস করা যাবে। একালে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল কোনো দুঃস্বপ্নের বিষয় নয়; যেখানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বুলেট ট্রেনের কথা ইতোমধ্যে সরকারি প্রস্তাবনায় চলে এসেছে বলে জানি।


পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সারাদেশের মানুষের মাঝে, বিশেষত পদ্মা সংলগ্ন ২১টি জেলার মানুষের মাঝে যে আবেগ-উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়েছে, সেগুলো নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। মাত্র তিন ঘণ্টায় ঢাকা থেকে বরিশালে পৌঁছে যাওয়া বয়স্ক বাস যাত্রীদের আনন্দাশ্রু দেশের মানুষ টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করেছে। পদ্মাপারের মানুষ একটি সেতুর অভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে কিংবা যাত্রীবাহী যানবাহনে যে নিদারুণ সময় কাটিয়েছেন এতদিন; অবর্ণনীয় কষ্ট করেছেন; এর বর্ণনাও দেখা গেছে টিভি চ্যানেল আর পত্রপত্রিকার পাতায়। বিবিসি রেডিওতে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে অশীতিপর এক মানুষের আবেগভরা কথা শুনে নিজের অশ্রু ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল।’ এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে এখনই! পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ ঘিরে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এই তিন বিভাগের ২১টি জেলায় নতুন করে ১৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) স্থাপনের পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। ইতোমধ্যে ‘বেজা’ বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলায় ২০৫ একর জমি নিয়ে মোংলা ‘ইজেড’ স্থাপন করছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তিনটি শিল্প নির্মাণে এরই মধ্যে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশে প্রায় ১০৫ একর জমিতে স্থাপন করা হচ্ছে আরেকটি ‘ইজেড’।

৫২৫ ও ৬৮৬ একর জমি নিয়ে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা ও গোসাইরহাট উপজেলায় দুটি ‘ইজেড’ স্থাপনে ‘বেজা’ গভর্নিং বোর্ডের অনুমোদন রয়েছে। মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলায় ১ হাজার ১২৫ একর জমিতে ‘ইজেড’ স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। এসব ছাড়াও ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনার বটিয়াঘাটা, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশালের আগৈলঝাড়া, কুষ্টিয়া এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাতেও ‘ইজেড’ স্থাপনের পরিকল্পনা এবং কর্ম প্রক্রিয়াধীন বলে জানা যায় (সমকাল ২৯ জুন, ২০২২)।

এসব মহাপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে দেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক অবয়ব। দেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই উন্নয়ন শুধু নিজেদের এলাকাতেই নয় বরং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন তথা জিডিপিতে যোগ করবে ইতিবাচক ‘মাইলেজ’। ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যে ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান নির্ণয়ের লক্ষ্য স্থির করেছে, তাতে এই উন্নয়ন প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবে। প্রভাবক হবে পদ্মা সেতু।

আনন্দের দিনেও পেছন ফিরে তাকিয়ে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণের পথটি সহজ ছিল না। বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় (প্রধানত) নির্মাণের কথা ছিল পদ্মা সেতু। কিন্তু ‘দুর্নীতি’র অজুহাত দিয়ে নির্মাণ সহযোগিতা থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। এখানেই থেমে থাকেনি এ প্রতিষ্ঠান। ওই সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি এক বিবৃতিতে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে বাংলাদেশকে ঋণ পেতে হলে অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। অনেক কথার মাঝে তিনি এটাও বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত) কোন পদ্ধতিতে হবে, সে বিষয়েও শেখ হাসিনাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে বিশ্বব্যাংকের কাছে। যেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও হার মানায় তাদের ‘আবদার’। শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পাননি কানাডার আদালত। সত্যের জয় হয়েছে।

বিগত আড়াই হাজার বছরের খাতায় বাঙালির অনেক ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। সেসব ইতিহাস রচিত হয়েছে বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন সময়ের হাত ধরে। সেসব ইতিহাসের কোনোটা বেশ উজ্জ্বল, কোনোটা কালো; কোনোটা আবার ম্রিয়মাণ! কিন্তু ২৫ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে যে নতুন পাতাটি যুক্ত হলো, তা শুধু বাংলাদেশই নয়; বিশ্বের জন্য এমন এক দৃষ্টান্ত, যা যুগে যুগে মানুষ স্মরণ করবে ‘দৃঢ়তা, গর্ব আর প্রতিবাদ’-এর এক ইতিহাস হিসেবে।

পদ্মা সেতু লোহালক্কড়ের একটি স্থাপনাই শুধু নয়; এটি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা, দক্ষতা, আর সৎসাহসের উজ্জ্বল প্রতীক। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতার ক’টি লাইন উদ্ধৃত করে বলেছেন- ‘সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয় : / জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি