রবিবার ১৪ অগাস্ট ২০২২



আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর


আলোকিত সময় :
24.07.2022

আবদুল মান্নান

সপ্তাহ তিনেক দেশের বাইরে ছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের দ্বিবার্ষিক সম্মিলনীতে অংশ নিতে। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম বাইরে যাওয়া। প্রায় আড়াই বছর কভিড-১৯-এর কারণে অনেকটা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থাকতে হয়েছে।

এই সময়ে দেশের বাইরে যাওয়া মানে নানা ধরনের বাড়তি কাগজপত্র আর বিমান সংযোগ পাওয়ার ঝক্কি। বিমান সংস্থাগুলো টিকিটের দাম বৃদ্ধির একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে মনে হলো। টিকিটের দাম ঘণ্টায় ঘণ্টায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। টিকিট এই আছে তো এই নেই। অনেক কষ্টে পাওয়া গেল টিকিট। মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমান সংস্থার বিমানে দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস (এলএ) হয়ে আমার গন্তব্যস্থল হনলুলু।

রাতের ফ্লাইট। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে পাসপোর্ট আর বোর্ডিং পাস এগিয়ে দিতেই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে সালাম দিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনি তো ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন। ’ জবাবে বলি, আমি তো এখন কোনো ভিআইপি পদ ধারণ করি না। ইমিগ্রেশন অফিসার অবাক হয়ে বললেন, কত মানুষই তো ভিআইপি না হয়ে প্রতিদিন এই সুযোগ গ্রহণ করছেন। বলি, তাঁরা হয়তো সাবেক বা বর্তমান আমলা হবেন, কারণ তাঁরা আজীবন ভিআইপির সুযোগ পেয়ে থাকেন। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর সুবিধাভোগী পেশার মানুষ তাঁরা। তাঁদের সঙ্গে আমাদের তুলনা না করাই ভালো। একটি চেক ইন লাগেজ ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত চেক ইন করেছিলাম। এলএতে গিয়ে দেখি, আমি ইমিগ্রেশন পার হওয়ার আগেই আমরা ব্যাগ চলে এসেছে। এরপর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে হনলুলু যেতে হবে। এখানে প্রথম চেক ইন ব্যাগের জন্য ৩০ ডলার আর পরেরগুলোর প্রতিটির জন্য ভাড়া গুনতে হবে ৪৫ ডলার। আমার একটা ব্যাগই ছিল। বেশির ভাগ মার্কিন ছোট কেবিন ব্যাগ বা ব্যাকপ্যাক নিয়ে ভ্রমণ করেন।

সময়মতো বিমান ছাড়ল। বিমানবালার কাছে পানি চাইলে তিনি বললেন, দুই ডলার লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোতে পানিসহ সব ধরনের খাবার কিনে খেতে হয়। তা-ও আবার ক্রেডিট কার্ডে। প্রায় সব কেনাবেচা কার্ডেই করার রেওয়াজ। ক্যাশ টাকার লেনদেন খুবই সীমিত। বিমানের মধ্যে খাবারের দাম প্রায় দ্বিগুণ। যাত্রীরা অনেকেই খাবার কিনে বিমানে চড়েন। রাতে হনলুলুতে পৌঁছে ট্যাক্সি নিয়ে যখন আমার পুরনো ক্যাম্পাসে পৌঁছলাম তখন রাত প্রায় ১১টা। ট্যাক্সিভাড়া দিতে গিয়ে দেখি এর আগে ২০০৮ সালে যখন এসেছিলাম তার তুলনায় এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে তিন গুণ হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনের বেলায় দেখি পুরো ক্যাম্পাস খাঁ খাঁ করছে। আগে গ্রীষ্মে সব বিভাগেই কিছু ক্লাস হতো। সেমিস্টার ১২ সপ্তাহের বদলে ছয় সপ্তাহে কমিয়ে আনা হতো। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে এই বছর থেকে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ।

হনলুলুতে সম্মিলনী অনুষ্ঠান শেষ করে এলএ। এখানে আমার বন্ধু ইফতেখারের সঙ্গে কয়েক দিন সময় কাটাব। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম দেখা হবে। আগেই পৌঁছানোর সময় বলে দিয়েছিলাম। সে জানিয়েছে, নেমেই যেন ফোন দিই। এখানে গাড়ি পার্কিংয়ে রাখলে পাঁচ থেকে ১০ ডলার দিতে হবে। ব্যাগ নিয়ে ট্রলি খুঁজতে গিয়ে দেখি তা নিতে হলে ছয় ডলার ভাড়া দিতে হবে। এই দেশে বিনা পয়সায় কিছুই মেলে না। ইফতেখারের বাসায় গিয়ে দেখি সে আমার জন্য বরাদ্দ কক্ষ আগে থেকেই এসি চালিয়ে ঠাণ্ডা করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্টেটে বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুতের পিক আওয়ার। এই সময় বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তার বিল দিতে হবে দ্বিগুণ হারে। এসি, ওয়াশিং মেশিন, ডিশ ওয়াশার, রান্নাবান্না মানুষ এই সময়টা এড়িয়ে করার চেষ্টা করে। বাড়িতে যতটুকু আলো না থাকলেই নয়, তাই জ্বালানো হয়। আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা চালু করতে পারলে বিদ্যুতের কিছুটা হলেও সাশ্রয় হবে বলে বিশ্বাস। ইফতেখার আরো জানাল, বাড়িতে গাড়ি ধোয়া নিষেধ। তা করার জন্য কার ওয়াশিংয়ের দোকানে নিয়ে যেতে হবে। সেই সেবার রেটও সময়ভেদে কমবেশি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে দেখি দেশে দুটি জিনিস নিয়ে বিএনপি শিবিরে কেমন যেন ঈদের আনন্দ। প্রথমটি হচ্ছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া আর দ্বিতীয়টি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোড শেডিং। এমন ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে চালু হয়েছে। মূল কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া। দেশে ফিরে দেখি এই দুটি বিষয় নিয়ে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও কিছু বামপন্থী দল আর টক শো বিশেষজ্ঞ বেশ সোচ্চার। বিএনপি তো কোরবানির বাজারে গরুর দাম বাড়লেও বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বসে। এই দুটি বিষয় তো তাদের জন্য বাড়তি পাওয়া। আরো মজার বিষয় হচ্ছে, এসব বিষয় নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের সার্বিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার তেমন কোনো যোগ্যতা আছে বলে মনে হয় না। অনেকটা আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর নেওয়ার মতো। অনেকে তো বলেই চলেছেন, বাংলাদেশ এখন শ্রীলঙ্কার পথে। বিশ্বে সম্ভবত বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা সব সময় নিজের দেশের সমস্যা দেখলে আনন্দিত হয়। সেটি বেশি হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে। বিজ্ঞজনরা অনেকবার গণমাধ্যমে এসে বলেছেন ও ব্যাখা করেছেন বাংলাদেশ কেন কখনো শ্রীলঙ্কা হবে না। যখন এসব বিষয় নিয়ে দেশের মধ্যে সরকারবিরোধী শিবিরে ঈদের আমেজ ঠিক তখনই আইএমএফ ঘোষণা করল, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৪১তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অনেক সমস্যার জন্ম দিয়েছে। জ্বালানি ও খাদ্যশস্য সরবরাহ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি হিসেবে এলএনজি, কয়লা, ডিজেল ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। বিশ্ববাজারে একদিকে এসব জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, অন্যদিকে ইউরোপে যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানীকৃত জ্বালানির দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার এই খাতে ভর্তুকি না দিলে ব্যবহারকারীদের আরো বেশি দামে বিদ্যুৎসেবা কিনতে হতো। তার ওপর আছে সিস্টেম লস। যার সঙ্গে এক শ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ বিদ্যুৎকর্মী জড়িত।

আগামী শীতের মৌসুমে ইউরোপের অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে, যদি রাশিয়া ইউরোপীয় দেশগুলোত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে শুধু ইউরোপেই নয়, অনেক দেশে বিদ্যুৎ রেশনিং শুরু হয়েছে। তারা যেসব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছিল সেগুলো আবার সচল করার ব্যবস্থা নিচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়া ও জাপান তাদের জনগণকে অনুরোধ করেছে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে। সেসব দেশে সরকার অনুরোধ করলে মানুষ বিষয়টির গুরুত্ব বোঝে। আমাদের দেশেও প্রধানমন্ত্রী এমন অনুরোধ করেছেন; কিন্তু এই দেশে অনুরোধে কাজ হয় না বলে বাধ্যতামূলক লোড শেডিংয়ের আশ্রয় নিতে হয়। আর যাঁরা এই লোড শেডিং নিয়ে মাঠ গরম করতে তৎপর, তাঁরা কি ভুলে গেছেন বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের কথা। তখন কিন্তু কোনো যুদ্ধ বা অন্য কোনো সংকট ছিল না। তখন রাতে-দিনে প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকত না। সেই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল আনুমানিক ছয় হাজার মেগাওয়াট আর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল তিন হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বেশি। সক্ষমতা আছে ২১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের আর চাহিদা ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এই মুহূর্তে সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জোগান সরবরাহ করা, যা এককভাবে সরকারের ওপর নির্ভর করে না। তবে সরকার যদিও বলেছে, এলকাভিত্তিক পালা করে এক ঘণ্টা লোড শেডিং হবে, বর্তমানে অনেক জায়গায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে তা মানা হচ্ছে না। অনেকের ধারণা, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য তা স্যাবোটাজ হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের দিক থেকে ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬তম এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বিএনপি-জামায়াত যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩.৮৭ বিলিয়ন ডলার। তারা যখন ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে তারা তাদের প্রথম বছরে ১.৭২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ দিয়ে বছর শেষ করে। আর আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে তখন এক-এগারোর সরকারের রেখে যাওয়া সাত বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ দিয়ে যাত্রা শুরু করে। তা বেড়ে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ৪৮ বিলিয়ন ডলার দাঁড়ায়। এই রিজার্ভ কখনো এক বা দুই বিলিয়ন ডলার কমেছে বা বেড়েছে। গত বছর এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলো থেকে আমদানি বাবদ দুই বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে, যার কারণে বর্তমানে এই রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আসলে বিষয়টা হচ্ছে এই যে ৪০ বা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের কথা বলা হচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের আমলেই হয়েছে। এটা যখন ৩৮ বা ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে তখন বুঝতে হবে আওয়ামী লীগ নিজের সৃষ্ট রেকর্ডের সঙ্গে লড়াই করছে।

একটি দেশের তিন বা চার মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করার মতো যদি রিজার্ভ থাকে, তাহলে এই রিজার্ভ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের যে রিজার্ভ আছে তা ছয় থেকে সাত মাসের আমদানি বিল পরিশোধ করার জন্য যথেষ্ট। আর যাঁরা এই রিজার্ভ নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন তাঁরাই পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গেলে বিশ্বব্যাংকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সরকার অপ্রয়োজনীয় বিলাসপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে তা মনিটর করার ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। এর সঙ্গে আছে শিল্পের বা অন্যান্য জরুরি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যেন তা ওভার ইনভয়েসিং (মূল্য বাড়িয়ে বলা) না হয়। শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থার জন্য যে কয়টি কারণ উল্লেখ করা হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাষ্ট্রের নেতৃত্বের অক্ষমতা বা দুর্বলতা, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় দেশের নানা ক্রান্তিকালে যে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর ওপর আস্থা না রাখার কোনো কারণ নেই। কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি