রবিবার ১৪ অগাস্ট ২০২২



শিমুলিয়া ঘাটে বাঁধা স্পিডবোট, বিপাকে চালকরা


আলোকিত সময় :
04.08.2022

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি :

পদ্মা সেতু চালুর পর শিমুলিয়া ঘাটকেন্দ্রিক দুই হাজার ২৫৮ জন লঞ্চ ও স্পিডবোটচালক-কর্মী এবং খুদে ব্যবসায়ী বেকার হয়ে পড়েছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই ব্যক্তিদের পরিবারের ওপর। বেকার হয়ে পড়া এই মানুষগুলোকে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। তবে তারা আশায় আছেন সরকার তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেবে।

গত সোমবার শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, লঞ্চঘাটে সারি সারি লঞ্চ বাঁধা। তবে কোনো যাত্রী নেই। স্পিডবোট ঘাটেও বাঁধা কয়েকটি স্পিডবোট। সেখানেও দেখা মেলেনি যাত্রীর। ঘাটের ওপর যাত্রীছাউনিতেও নেই যাত্রী। ফলে সেখানকার খুদে ব্যবসায়ীদের দোকানগুলো বন্ধ। নেই হকারদের ছোটাছুুটি। একদা কর্মব্যস্ত শিমুলিয়া ঘাট এখন চুপচাপ। কয়েকজন লঞ্চ ও স্পিডবোটচালক বসে ছিলেন যাত্রীর অপেক্ষায়। কিন্তু দিনভর একটি লঞ্চও ছেড়ে যায়নি এই ঘাট থেকে। অন্যদিকে গত রবিবার বিআইডাব্লিউটিএর শিমুলিয়া ঘাটের কর্মকর্তা খুদে ব্যবসায়ীদের তাদের দোকানপাট গুটিয়ে নিতে বলেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিমুলিয়া থেকে মাঝিকান্দি ও বাংলাবাজার নৌ রুটে ৮৭টি লঞ্চ, ১৫৫টি স্পিডবোট ও ৫০টি ট্রলার চলাচল করত। প্রতিটি লঞ্চে একজন মাস্টার, একজন চালক, একজন সুকানি, একজন গ্রিজার, একজন লস্কর, একজন কেরানি, একজন বাবুর্চি, একজন ম্যানেজারসহ মোট ৯ জন কাজ করতেন। আর লঞ্চঘাটে মালিক সমিতির সুপারভাইজারসহ আরো ১৫ জন কাজ করতেন। সব মিলিয়ে ৮৭টি লঞ্চে কর্মরত ছিলেন ৭৯৮ জন স্টাফ। আবার ৮৭টি লঞ্চে একাধিক মালিকসহ দেড় শতাধিক মালিক রয়েছেন। তাদের পরিবার নির্ভর করত লঞ্চের আয়ের ওপর।

অন্যদিকে এই ঘাটে ১৫৫টি স্পিডবোটে দুজন করে প্রতিদিন কাজ করতেন ৩১০ জন। আর ৫০টি ট্রলারে ১০০ জন। পদ্মা সেতু চালুর পর লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বিপুলসংখ্যক কর্মীসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে।

ঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন দুই হাজারের বেশি খুদে ব্যবসায়ী ও হকার। তাদের প্রতিদিনের উপার্জন দিয়েই চলত তাদের পরিবার। বেকার হয়ে পড়ায় বর্তমানে তাদের পরিবারের সদস্যরাও কষ্টে পড়েছে।

ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে আগে তা কেউ ভাবতে পারেননি। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় বর্তমানে তারা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকে ধারদেনা করে চলছেন। এ পরিস্থিতিতে তারা তাদের পুনর্বাসন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন।

এমভি সাগরপারে লঞ্চের মাস্টার হায়দার হোসেন (৩৭) জানান, মা-বাবাসহ তার পরিবারের সদস্যসংখ্যা সাতজন। মাসে বেতন পেতেন ৮-৯ হাজার টাকা। ওই টাকা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালাতেন। এই রুটের লঞ্চগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। ফলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বর্তমানে কষ্টে আছেন।

এমভি পানিরাজ লঞ্চের মাস্টার মাসুদ আলম (৪৫) জানান, স্বামী-স্ত্রী, মা, মেয়েসহ তার আট সদস্যের পরিবার। তার ওপরে পুরো পরিবার নির্ভরশীল। মালিকপক্ষ থেকে অন্য রুটে লঞ্চ চালানোর কোনো নিশ্চয়তা এখনো পাননি। ফলে বড় অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারই পারে তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিতে।

শিমুলিয়া ঘাটের স্পিডবোট মালিক আব্দুল মালেক বলেন, ‘পাঁচ মাস আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা কিস্তি তুলে একটি স্পিডবোট কিনেছিলাম। লাইসেন্স করতে সঞ্চয়ের টাকাও শেষ। ঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন আমার মাথায় হাত। এখন স্পিডবোটটিও বিক্রি করে দেওয়া যাচ্ছে না। একদিকে সংসার, অন্যদিকে কিস্তির টাকা, বড় বিপদে পড়ে গেলাম। ’

স্পিডবোট মালিকরা জানান, প্রতিটি বোটের জন্য তারা চার থেকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। পদ্মা সেতু চালুর পর এসব বোট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সংসার চালাতে তারা বিপদে পড়েছেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার মাওয়া জোনের সভাপতি ও হানজালা লঞ্চের মালিক মোশারফ হোসেন নসু বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর আমরা ৮৭টি লঞ্চের মালিক ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছি। সেতুর কারণে অন্য ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পেলেও আমরা পাইনি। মাওয়া জোনের লঞ্চ হওয়ায় আমরা অন্য রুটেও যেতে পারছি না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, আমাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা হোক। ’

এদিকে বেকার হয়ে যাওয়া খুদে ব্যবসায়ী খলিল শিকদার (৩৭) জানান, ১০-১২ বছর বয়েস থেকে পুরনো মাওয়া ঘাটে ফল বিক্রি করছেন তিনি। কয়েক দফা ঘাট পরিবর্তনের পর শিমুলিয়া ঘাটে ফলের ব্যবসা করছিলেন। তার পরিবারে সদস্যসংখ্যা সাতজন। প্রতিদিন আয় হতো ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘লঞ্চ, স্পিডবোট মালিক সমিতি, খুদে ব্যবসায়ী বা শ্রমিক সমিতিগুলোর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি, লিখিতও দেয়নি। সরকার পর্যটনকেন্দ্রিক অনেক কিছু করতে যাচ্ছে। ’



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি