বুধবার ৭ ডিসেম্বর ২০২২



কলঙ্কিত ৭ নভেম্বর : দায় ও মুক্তি


আলোকিত সময় :
07.11.2022

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

৭ নভেম্বর বাংলাদেশের জন্য একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যা ঘটেছে তার পরিণতিতে বাংলাদেশকে আমরা হারাতে বসেছিলাম। বিশ্বের বড় বড় থিংকট্যাংক ও গবেষক এই মর্মে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে বাংলাদেশ আরেকটি পাকিস্তান বা আফগানিস্তান স্টাইলের রাষ্ট্র হতে চলেছে। কিন্তু বাঙালি জাতির সংগ্রামী ইতিহাস ও একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জনের বোধ হয় একটা সহজাত অমোঘ শক্তি রয়েছে, যার জোরেই বাংলাদেশ এখনো বাংলাদেশ আছে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি একনাগাড়ে ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও বৃহত্তর জনমানুষের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মেরুকরণে এমন বড় কোনো পরিবর্তন দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, যার ওপর ভরসা করে মানুষ শঙ্কামুক্ত থাকতে পারে।

১৯৭৫ সালে রচিত কলঙ্ক থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে মুক্ত করার পথ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই পথের সন্ধান যাঁরা দিতে পারেন, তাঁরা এ নিয়ে কী ভাবছেন, তা স্পষ্ট নয়। ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, একটি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে চাটুকারিতা, মোসাহেবি, নির্লজ্জ তোষামোদি এবং সঙ্গে অবৈধ টাকা যখন সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাস করে ফেলে, তখন সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এ রকম অবস্থায় রাষ্ট্র যাতে না পড়ে তার জন্য ম্যাকিয়াভেলি সুনির্দিষ্ট পন্থার কথাও বলেছেন, যা আজ একবিংশ শতাব্দীতেও প্রাসঙ্গিক। দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি এক বিষয়, আর মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনা অন্য বিষয়। অনেক মনীষীই বলেছেন, মানুষের মনোজাগতিক মূল্যবোধের উন্নতি একটি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। এটি হলে সেই জাতিকে পেছনে তাকিয়ে আর শঙ্কিত হতে হয় না। গত ১৪ বছরে মানুষের মনোজগতের কতখানি উন্নতি ঘটেছে, সেটি ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মতিউর রহমান নিজামীর মতো গণহত্যাকারী এবং সাকা চৌধুরীর মতো কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও কুরুচিপূর্ণ ব্যক্তিকেও বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিয়ে একবার নয়, কয়েকবার সংসদ সদস্য বানিয়েছে। নিজামী আর সাকা একটি বড় প্রতীকী উদাহরণ মাত্র। এ রকম নিজামী-সাকা অনেক আছেন, যাঁরা আগে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। সুতরাং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের কলঙ্ক থেকে দেশকে মুক্ত করতে চাইলে মানুষের মনমানসিকতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে কী ঘটেছিল এবং তার মধ্য দিয়ে কী রকম কলঙ্ক রচিত হয় তার কিছু সংক্ষেপে তুলে ধরি।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যা ঘটেছিল, তার সঙ্গে ওই বছরের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরে জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অপরিকল্পিত ও অপরিপক্ব মাত্র চার দিন স্থায়ী একটি ক্যু প্রচেষ্টা এবং ঢাকা জেলের অভ্যন্তরে চারজন জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পরিণতিতে দেশের অভ্যন্তরে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিশ্বাসঘাতক অবৈধ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের পছন্দ অনুযায়ী ১৫ই আগস্টের মাত্র ৯ দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট নতুন সেনাপ্রধান হন জেনারেল জিয়াউর রহমান। কিন্তু তিনি সেনাবাহিনীর ভেতরে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। বঙ্গভবনে বসে সেনাবাহিনীর সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত হত্যাকারী মেজররা, যা সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডারসহ সিনিয়র অফিসারদের জন্য ছিল অত্যন্ত অপমানজনক। সুতরাং ৩ নভেম্বরে সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি ক্যু ঘটানোর চেষ্টা হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সসম্মানে ঢাকা সেনানিবাসের নিজ গৃহে বন্দি করা হয়। কিন্তু ৩ থেকে ৬ নভেম্বর রাত পর্যন্ত খালেদ মোশাররফ গ্রুপ বঙ্গভবনে বসে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে দেনদরবারে এতই ব্যস্ত থাকে যে ওই চার দিন ঢাকা সেনানিবাসে কী ঘটছে তার কোনো খবর রাখেনি, সেনাবাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী ও ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ফাঁকা মাঠের অবারিত সুযোগটা গ্রহণ করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তাদের নিয়োজিত এজেন্ট ও চরদের মাধ্যমে ঢাকা সেনানিবাসের প্রতিটি ইউনিটে হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করে এই মর্মে যে জেনারেল খালেদ মোশাররফ ভারতের দালাল, ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিচ্ছেন এবং অতি শিগগির ভারতীয় সেনাবাহিনী ঢাকায় চলে আসছে। ওই সময়ে সেনা সদরে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল পদে থাকা মেজর জেনারেল মঈনুল হুসেন চৌধুরী ‘দ্য সাইলেন্ট উইটনেস বাই আ জেনারেল’ গ্রন্থে লিখেছেন, খালেদ মোশাররফের সঙ্গে ভারত ও আওয়ামী লীগের কোনো সংযোগ ছিল না। ৬ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা ক্যু হয়। এতে জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে আবার সেনাবাহিনীর জেনারেল পদে ফিরে আসেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।

৬ নভেম্বর রাত ১২টার পরপরই একদল জেসিও-এনসিও গৃহবন্দি থেকে মুক্ত করে জেনারেল জিয়াকে নিকটবর্তী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসে না নিয়ে তাঁকে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর হত্যায় অংশগ্রহণকারী দুই ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের অফিসে, যার কমান্ডিং অফিসার তখন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের একজন মেজর মহিউদ্দিন। এতে বোঝা যায় সেদিন গৃহবন্দি থেকে মুক্ত হয়ে জেনারেল জিয়া পাকিস্তান থেকে ফেরত তথাকথিত বিপ্লবী অমুক্তিযোদ্ধা জেসিও-এনসিওদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর মহিউদ্দিনের অফিসকেই নিরাপদ মনে করেছেন। মেজর জেনারেল মঈনুল হুসেন চৌধুরী ‘দ্য সাইলেন্ট উইটনেস বাই আ জেনারেল’ গ্রন্থের ৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলো যোগ দেয়নি, যোগ দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর হত্যায় জড়িত আর্টিলারি ও ট্যাংক ইউনিট এবং অন্যরা, সেখানে সবাই ছিলেন পাকিস্তান প্রত্যাগত। সুতরাং ১৫ই আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের হত্যাকারীরা একই গোষ্ঠীভুক্ত এবং একই বিদেশি রাষ্ট্র কর্তৃক সমর্থিত।

৭ নভেম্বর সকালে শেরেবাংলানগরে অবস্থিত ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসে সেক্টর কমান্ডার বীর-উত্তম জেনারেল খালেদ মোশাররফ, সেক্টর কমান্ডার কর্নেল হায়দার বীর-উত্তম ও সাবসেক্টর কমান্ডার কর্নেল হুদা বীরবিক্রমকে হত্যা করা হয়। ঢাকা সেনানিবাসে আরো ডজনখানেক অফিসারকে হত্যা করা হয়, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলেও এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার না করার ফলে যে কলঙ্ক রচিত হলো, তার হাত ধরে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে একের পর এক কলঙ্ক রচিত হতে থাকে। আবির্ভাব ঘটে অপরাজনীতির। হোন্ডা, গুণ্ডা আর হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের রাজনীতি সব কিছুকে গ্রাস করে ফেলে। জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পর কী ঘটল তার কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করি। এক. বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে যাঁরা হত্যা করলেন, তাঁদের বিচার করা যাবে না—এই মর্মে আইন এবং পুরস্কারস্বরূপ তাঁদের দূতাবাসে চাকরি প্রদান শুধু নয়, পদোন্নতি দেওয়া হলো। দুই. একাত্তরে জামায়াতের প্রধান গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে পালিয়ে যান এবং পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে লন্ডনে বসে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু করেন। পঁচাত্তরের পর ১৯৭৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন চালু রেখে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পেলেন। তখনকার সরকার এতটুকু বলল না যে আপনি স্বাধীন বাংলাদেশে যে অজুহাতেই আসুন না কেন, পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন বাতিল করে আসতে হবে। তিন. পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের সংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফসল এবং দেশের শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ মানুষের ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তিতে জাতির পিতার সারা জীবনের সংগ্রামী চিন্তার ফসল, আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের মূলমন্ত্র বাহাত্তরের সংবিধান কোনো রকম ডিউ প্রসেস অনুসরণ না করে জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশ দ্বারা বাতিল করে দিলেন। সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে মুক্তি ও সংগ্রাম শব্দ দুটি বাদ হয়ে গেল। এই শব্দ দুটির দোষ কী ছিল তার ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি, দেওয়ার সাহসও দেখায়নি। কিন্তু এই কাজটি হয়েছে ৭ নভেম্বরের ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বীর-উত্তম জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে, সামরিক আদেশের মাধ্যমে। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবে মুক্তি শব্দটি বাদ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গেল। আর সংগ্রাম শব্দটি বাদ দেওয়ার ফলে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কবর হয়ে গেল এবং পাকিস্তানের সব অপকর্ম, শোষণ, শাসন ও নির্মম অত্যাচারের বিস্তর কাহিনি আড়ালে চলে গেল। এই কাজগুলো বাংলাদেশের কোনো মানুষের এজেন্ডা হতে পারে না, এটি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এজেন্ডা।

একাত্তরের গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের পুনরুত্থান ৭ নভেম্বরের ফসল। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে নিজেদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি জামায়াতের দুজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পদ দিল। মন্ত্রী হয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন একাত্তরে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে তাঁরা গালাগাল করেছেন, স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পরেও তাঁদের কাছ থেকে একই রকম গালি শুনতে হলো। এর থেকে বড় কলঙ্ক বাংলাদেশের জন্য আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি একনাগাড়ে তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও কলঙ্কের বোঝা থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে মুক্ত করার পথে কোনো অগ্রগতি নেই। বোঝা যাচ্ছে, গতানুগতিকতায় কিছু হবে না। তাই বিশাল গণজাগরণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি