মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪



একজন খোরশেদ আলী এবং ৫২ হাজার তালগাছ


আলোকিত সময় :
19.05.2023

নিজস্ব প্রতিবেদক :

৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ খোরশেদ আলী। পেশায় একজন পল্লী চিকিৎসক। নিজ এলাকায় তাল গাছ পাগল ডাক্তার নামেই পরিচিত সবার কাছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি তার রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধা। তাই বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন সড়কে ৫২ হাজার তাল গাছ লাগিয়েছেন তিনি। তার ইচ্ছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সর্বমোট ১ লাখ তালগাছ লাগাবেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুই ধারে লাগানো গাছের পরিচর্যা করছেন তিনি। এভাবে গত ৯-১০ বছর ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলার সড়কে তাল গাছগুলো লাগিয়েছেন তিনি। এই কাজ করতে গিয়ে নিজের কৃষি জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। নিজের টাকায় আঁটি কিনে বিভিন্ন সড়ক ও গ্রামীন রাস্তার পাশে তাল গাছ রোপণ করেন তিনি।
গাছ পরিচর্যার এক ফাঁকে বৃদ্ধ খোরশেদ আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ইউনিয়নের পাহাড়ভাঙ্গা এলাকায় তার বাড়ি। স্ত্রী আর ৭ ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে তার সংসার। আয়ের উৎস বলতে কেবল নিজের অল্প কিছু কৃষি জমি আর পল্লী চিকিৎসা দিয়ে যতটুকু অর্থ উপার্জিত হয় ততটুকুই। এ দিয়েই চলে তার সংসারের খরচাপাতি।

এ বয়সে এসেও এত হাজার হাজার তালগাছ কেনও রোপন করছেন এমন প্রশ্নে খোরশেদ আলী বলেন, বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবার ও মহান মুক্তিযুদ্ধে যাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি সেসব শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় আমার এই উদ্যোগ। একই সঙ্গে মানুষ যাতে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পায় তাই সড়কের দুই ধার দিয়ে এখন পর্যন্ত ৫২ হাজার তালগাছের চারা রোপণ করছি। তবে ইচ্ছে আছে ১ লাখ তাল গাছ রোপন করা।

তাল গাছের যত্ন নেয়া প্রসঙ্গে খোরশেদ আলী জানান, প্রতিদিন মোটরসাইকেলযোগে বিভিন্ন সড়কে ১০০টি করে তাল গাছের চারা পরিচর্যা করি। তবে তাল গাছগুলো কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক উপড়ে ফেলছে, গাছগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি সহায়তা কামনা করেন তিনি।

ওই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলিম বলেন, তাল গাছ পাগল ডাক্তার দীর্ঘদিন ধরে অনেক গাছ লাগিয়েছেন মানুষের উপকার করার জন্য। তিনি এই গাছগুলো লাগিয়েছেন নিজ খরচে। অনেক সময় তিনি লোক নিয়ে এই চারাগুলো রোপন করেন। তিনি সাধারণত রাতের বেলায় চারা রোপন করেন। কারণ দিনে চারা রোপন করলে কেউ চারাগুলো নিয়ে নিতে পারে বা এই আঁটি খেয়ে ফেলতে পারে, তাই তিনি রাতের বেলায় এই চারা রোপন করেন। সাধারণত রাত বারোটা থেকে তিনটার মধ্যে এই চারা রোপন করেন তিনি।

একই গ্রামের বাসিন্দা সাগর আলী বলেন, তাল গাছ রোপণ করা নিয়ে তার পরিবারের মধ্যে অনেক সময় ঝগড়া হয়েছে। তিনি নিজ উদ্যেগে জমি বিক্রয় করেও তালের চারা রোপন করেছেন। এই মহৎ কাজ তিনি করে যাচ্ছেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উপকারের জন্য। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে কোন সহযোগীতা করলে তিনি আরো উৎসাহ পাবেন।

খোরশেদ আলী নিজ উদ্যোগে তালগাছের বীজ রোপন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলে জানান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক। প্রকৃতির সৌন্দর্য, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাল গাছের ভূমিকা অনেক। ইউপি কার্যালয় থেকে তাল গাছ রক্ষণাবেক্ষন বিষয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান খোরশেদ আলীর তাল গাছ রোপনকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, খোরশেদ আলীর তাল গাছ লাগানো সামাজিক ভালো কাজের একটি দৃষ্টান্ত। আমাদের জেলা প্রশাসন খোরশেদ আলীর তাল গাছ লাগানোকে উৎসাহিত করতে সহযোগীতা করবে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি