শনিবার ১৩ এপ্রিল ২০২৪



নির্বাচনী বিতর্ক পিছু ছাড়বে না


আলোকিত সময় :
15.06.2023

মো. জাকির হোসেন :

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশি-বিদেশি কিছু অধ্যাপক, মিডিয়া, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, তথাকথিত এনজিও কর্তা ও সুধী মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে এ দেশে। যাঁরা অহর্নিশ এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন পৃথিবী নামের এই গ্রহে শুধু বাংলাদেশের নির্বাচনেই অনিয়ম হয়। পৃথিবীর আর সব দেশ নির্বাচনের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত, পবিত্র। কয়েক দিন আগে টক শোতে তাঁদের একজনকে বলতে শুনলাম, আগামী নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে আসবেন না।

বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ভোটাররা আসবেন না। ভোটের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চলে গেছে। নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কায়েম হলেই ভোটাররা আবার ভোট দিতে আসবেন।

দেশবাসী দেখল বিএনপির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই গাজীপুর, খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে ভোট উত্সব।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জায়েদা খাতুন ক্ষমতাসীন দলের আজমতউল্লা খানকে পরাজিত করে জয়ী হলেন। সবাই বললেন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেই একই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে একই কায়দায় গাজীপুরের মতো অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থাকল।

একইভাবে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করল। নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয়ী হলেন। এবার বিএনপি মহাসচিব বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তার মানে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার শর্ত কি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত হতে হবে? বিষয়টি অনেকটা এ রকম, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’, তেমনি ‘আওয়ামী লীগকে হারিয়া প্রমাণ করিতে হইবে, নির্বাচন সুষ্ঠু হইয়াছে!’

পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এমন দেশের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি।

আর সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে এমন দেশ অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে। স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন রয়েছে এমন দেশের মধ্যে অন্যতম হলো—অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, পোল্যান্ড, রুমানিয়া, ভারত, জর্দান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ। এদের মধ্যে আবার যেসব দেশের নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার সাংবধািনিক নিশ্চয়তা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নেই। এসব দেশে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা কমিশন নির্বাহী বিভাগের অধীনে একটি শাখা, অধিদপ্তর কিংবা পরিদপ্তর হিসেবে কিংবা বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে কাজ করে। নির্বাহী বিভাগের শাখা হিসেবে নির্বাচন কমিশন রয়েছে ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তিউনিশিয়া, বলিভিয়া, কোস্টারিকা, পানামা, নিকারাগুয়া ও ভেনিজুয়েলায়। মিশ্র পদ্ধতির নির্বাচন সংস্থা রয়েছে ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, স্পেন, ক্যামেরুন ও সেনেগালে। এসব দেশে নির্বাচনী সংস্থা স্বাধীনভাবে নীতিমালা প্রণয়ন করে আর নির্বাহী বিভাগ নির্বাচনী সংস্থার তত্ত্বাবধানে সেসব নীতিমালা বাস্তবায়ন করে থাকে।

বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনী সংস্থা কাজ করে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ও ব্রাজিলে। সাংবিধানিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তাসহ একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবারই নির্বাচন কমিশন গঠন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কেন এত বিতর্ক? এর কারণ কি শুধুই নির্বাচন কমিশন কিংবা সার্চ কমিটি, না অন্য কোনো কারণ রয়েছে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের অধীন হলেও কমিশন নিয়ে এমন বিতর্ক নেই। বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে বিতর্ক তার মূল কারণ কমিশন নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা মতবিরোধ রয়েছে; কিন্তু তাদের মধ্যে বিভেদ ও শত্রুতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যেখানে একে অপরকে হনন করতে চায়, নির্মূল করতে চায়।

বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলের মধ্যে বিভেদ-শত্রুতা-আস্থাহীনতা এতটা চরম পর্যায়ে যে বিদেশ থেকে আমদানি করা নির্বাচন কমিশন দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করলেও নির্বাচনের বিতর্ক দূর হওয়ার নয়। অফিসের বড় কর্তা থেকে পিয়ন, রাজনীতি না বোঝা অবোধ শিশু আর দুনিয়া থেকে চূড়ান্ত অবসরগ্রহণের জন্য অপেক্ষমাণ বয়োবৃদ্ধ—সবাই বিভক্তির শিকার। পরস্পরবিরোধী দুটি চিন্তা-ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত মানুষের একটি অংশ মনে করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকতেই হবে। তাদের যুক্তি হলো, শুধু আওয়ামী লীগের জন্যই নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ও তার অস্তিত্বের জন্য দরকার আওয়ামী লীগকে তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ টিকে থাকতে হলে, জঙ্গিবাদ রুখতে হলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিকল্প নেই। অবকাঠামো উন্নয়নসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জয়রথ অব্যাহত রাখতে হলে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্ব অপরিহার্য। অন্যথায় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ।

অন্যদিকে এ চিন্তাধারার যাঁরা বিরোধী, তাঁরা মনে করেন এই সরকার তাদের আচরণে ক্রমেই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠছে। নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিএনপি ও তাদের মিত্রদের হামলা-মামলা-গুমের শিকারে পরিণত করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। যেকোনো মূল্যে এই সরকারের পতন ঘটাতেই হবে। প্রয়োজনে আমেরিকা ও অন্যান্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে হলেও এই সরকারের পতন চায় বিএনপি। এভাবেই প্রধান দুই দল ও তাদের সমর্থক-অনুসারীর মধ্যে বেড়ে উঠেছে ভয়ংকর বিভেদ, শত্রুতা ও জিঘাংসা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম নিয়েই দুই দলের মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর মতবিরোধ।

তাহলে কোন বাংলাদেশের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন? বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি তো এই সত্যই মানে না। বিএনপি ও তার মিত্ররা মুক্তিযুদ্ধে ভাসানীর অবদান ও সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ যে জেলে কাটালেন তা কী চুরি-ডাকাতি-খুন-রাহাজানির জন্য, না বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য? পৃথিবীর ৯০টির বেশি দেশে জাতির পিতা কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা রয়েছে। জাতির পিতা কিংবা রাষ্ট্রের স্থপতিকে নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও জাতির পিতাকে স্বীকার করে না বিএনপি। অন্যদিকে জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও জাতির পিতা হত্যায় সম্পৃক্ততা, খুনিদের বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি আইনকে সংশোধন করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপরীতে সংবিধান পরিবর্তন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার বন্ধ করা, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা, শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেওয়াসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নানা বিতর্কিত কাজ করেছেন। অস্বীকার করার ও পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার রাজনীতি যত দিন থাকবে, কমিশন অবাধ নির্বাচনের জন্য যতই কসরত করুক, যতই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করুক না কেন বিতর্ক পিছু ছাড়বে না।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কোনো দেশেই অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোনো বিধান নেই। শুধু পাকিস্তানের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা উল্লেখ থাকলেও তা অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হবে—এ কথা উল্লেখ নেই। শুধু বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়েই বিতর্ক হয় এমন নয়। পৃথিবীর বহু দেশেই নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক হয়। কয়েক শ বছর ধরেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের নির্বাচন নিয়ে অহর্নিশ বিতর্কের অন্ত নেই। অনেক দেশেই নির্বাচন নিয়ে নানা অনিয়ম, প্রতারণা, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সম্পদের ব্যবহার, ভোট গণনা নিয়ে বিতর্ক, ভোটের ফল পাল্টে দেওয়াসহ নানা অভিযোগে সহিংসতা ও মামলা হয়। উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব দেশেই নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক পরিলক্ষিত হয়। বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনী সংস্থা কাজ করে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ও ব্রাজিলে। লাতিন আমেরিকায় গণতন্ত্র রপ্তানির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯১২ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করেছে। তবু এসব দেশের একাধিক নির্বাচন নিয়ে তুমুল বিতর্ক রয়েছে। লাতিন আমেরিকায় ১৯৩১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অন্ততপক্ষে ১৬টি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা, নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যেসব দেশের নির্বাচনে এসব গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেগুলো হলো—আর্জেটিনা, উরুগুয়ে, পেরু, হাইতি, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, বলিভিয়া, হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়া। মেক্সিকোর ১৯৮৮, ২০০৬ ও ২০১২ সালের নির্বাচনে জালিয়াতি, ভোট ক্রয়, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারসহ গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশে পর পর কয়েকটি নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িতদের এবং তার পরিবারের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞাসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। অথচ আমেরিকার ইতিহাসে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক এই অনিয়মকে নির্বাচনী ‘ফলাফল ছিনতাইয়ের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ১৭৭২, ১৮২৪, ১৮৭৬, ১৮৮৮, ১৮৯১, ১৯৪৮, ১৯৬০, ২০০০, ২০০২, ২০০৪, ২০০৮, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ ও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট কিংবা সিনেট নির্বাচনে জালিয়াতি, ভোটার নিপীড়ন, ভোটার তালিকাভুক্তকরণে অনিয়ম,  Absentee Ballot  (তথা পোস্টাল, প্রক্সি, অনলাইন ভোটে) অনিয়ম, ভাঁওতাবাজি ও মিথ্যা সংবাদের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করা, প্রতিপক্ষ দলের ফোন ব্যাংক জ্যামিং, গ্যারি মেন্ডারিং, ভোট গণনা বিতর্ক, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের প্রতি ভয়ভীতি ও সহিংসতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে গুগলে সার্চ দিলে যে দেশের বিতর্কিত নির্বাচনের বিষয় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রদর্শন করে সেটি যুক্তরাষ্ট্র। কানাডার ১৯৫৭ ও ২০১১ সালের ফেডারেল নির্বাচনে ফল প্রভাবিত করতে অযোগ্যদের ভোটদানের সুযোগ করে দেওয়া, ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন হয়েছে এমন মিথ্যা ফোনকলে ভোটারদের প্রতারণা করা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে বঞ্চিত করা ও ভোটার নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ করেছে ইউরোপের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা  Organization for Security and Co-operation in Europe (OSCE) । ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। প্রতিপক্ষ Strache দাবি করেছেন যে ৩০ হাজারেরও বেশি ভোট অগ্রিম গণনা করা হয়েছে। ৫০ হাজারেরও বেশি ভোট অননুমোদিত কর্মীদের দ্বারা গণনা করা হয়েছে এবং পাঁচ লাখের বেশি ব্যালট অবৈধ ছিল। এ ছাড়া অভিযোগ করা হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অনাগরিকদের ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছু অনিয়ম স্বীকার করেছে, তবে বলেছে যে প্রভাবিত ভোটের সংখ্যা ফলাফল উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

২০১২ ও ২০১৮ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আছে। অনিয়মের মধ্যে অন্যতম হলো পুতিনের পক্ষে কারচুপি করে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা ও  carousel voting  তথা বাসভর্তি করে একদল ভোটারকে বিভিন্ন কেন্দ্রে নিয়ে বারবার ভোটদানের সুযোগ দেওয়া। ইউক্রেনের পক্ষ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সিযুদ্ধ করছে। অথচ ইউক্রেনের ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৫৮ সালের পর্তুগিজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন  Americo Thomaz ও  Humberto Delgado। নির্বাচনে সাধারণ প্রত্যাশা ছিল  Humberto Delgado-র ভূমিধস বিজয় হবে। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়  Thomaু ৭৬.৪ শতাংশ ও Delgado ২৩.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। নির্বাচনে  Delgado-র সমর্থকদের ব্যাপক হয়রানি ও সহিংস আক্রমণ করা হয়। নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি করা হয়। ভোট গণনার সময়  Delgado-র প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রকল্প ‘আরব বসন্ত’ চালু করেছিল। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৬ থেকে ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ৯টি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যেসব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে সেগুলো হলো—ইরান, ইরাক, সিরিয়া, জর্দান, বাহরাইন ও ফিলিস্তিন। ১৯৯১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত ৫২টি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। যেসব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো হলো—আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, চাদ, ক্যামেরন, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া, মিসর, উগান্ডা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে, গিনি, আইভরি কোস্ট, মৌরিতানিয়া, লিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালাবি, জাম্বিয়া, সুদান টোগো, বুরুন্ডি, তানজানিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, জিবুতি ও গ্যাবন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নির্বাচন নিয়েও রয়েছে তুমুল বিতর্ক। দক্ষিণ কোরিয়া পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ হলেও অতীতে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল। ফিলিপাইন, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং, তাইওয়ান, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার কোনো কোনো নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সদ্যঃসমাপ্ত তুরস্কের নির্বাচন নিয়েও কেমাল কিলিচদারওলুর অভিযোগ, তুরস্কের সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি কারচুপি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দল তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সব কটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে।

রাশিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরি, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া ছাড়াও ইউরোপের আরো অনেক দেশের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যেমন—রুমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া ও বেলারুশ।

নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ বহু আগে থেকেই পৃথিবীর অনেক দেশের সরকারের বিরুদ্ধে ছিল, আছে, থাকবে। এ জন্য কোনো দেশের বিরোধী দলই বিদেশি রাষ্ট্রকে ডেকে এনে নিজ রাষ্ট্রকে অপমান করে না। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলে উল্লসিত হয় না। ছোট নিষেধাজ্ঞা দিলে মন খারাপ করে না। যারা বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের জন্য লবিং করে, উল্লসিত হয়, তারা আর যাই হোক বাংলাদেশের বন্ধু নয়।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি